কয়রা উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও কাঁদাযুক্ত বালু ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পাশের একটি মৎস্য খামার থেকে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন এবং পুরোনো সোলিংয়ের ইট অপসারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের কারণে কোটি টাকার সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিন উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বতুল বাজার এলাকায় দেখা যায়, রাস্তার কিছু অংশের কাজ শেষ হয়েছে। নির্মিত অংশে মানসম্মত ইটের পাশাপাশি নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা রয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক রাস্তার সাব গ্রেডের উপর থেকে কাঁদাযুক্ত কিছু বালু কেটে দুই পাশে ফেলছেন। ইট বিছানোর পরে সেই বালু ছিটিয়ে দেওয়া হবে বলে তারা জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরুতে নিম্নমানের ইট আনা হলে প্রতিবাদের মুখে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে কিছুদিন মানসম্মত ইট দিয়ে কাজ করে পুনরায় নিম্নমানের ইট এনে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তার সাব গ্রেড তৈরি ও হেরিং বোন বোল্ডের উপরে কাঁদাযুক্ত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে, নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য রাস্তার পাশের একটি মৎস্য খামার থেকে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করে রাস্তার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
জানা যায়, ওই খামার থেকে বালু সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু হাসান। তিনি প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ঠিকাদারের কাছ থেকে ১৫ টাকা করে নিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্পের শুরু থেকেই ওই ইউপি সদস্য নির্মাণকাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া সড়কটি নির্মাণের আগে সেখানে ইটের সোলিং ছিল। সেই সোলিংয়ের ইট তুলে ইউনিয়ন পরিষদে জমা না দিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন ওই ইউপি সদস্য।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে উত্তর বেদকাশী ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে মোট দেড় কিলোমিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২৮ এপ্রিল শুরু হয়ে ১০ জুনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার নির্দেশনা থাকলেও, অদ্যাবধি ৫০ শতাংশের মতো কাজ শেষ হয়েছে। তবে পরবর্তীতে কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স হাজী এন্ড সন্স কর্পোরেশন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু হাসান বলেছেন, “সোলিংয়ের ইট একত্রিত করে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার মাঠে রাখা হয়েছে। যা ইউনিয়ন পরিষদের সকলে অবগত রয়েছে। রেজুলেশনের মাধ্যমে পরে অন্য একটি সরকারি কাজে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।”
বালু উত্তোলনে তার কোনো বাণিজ্য নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, সেখানকার বালু অনেক ভালো, তবে উত্তোলনের সময় উপরে সামান্য কাঁদার স্তর পড়েছে। যা কেটে ফেলে দেয়া হচ্ছে। আর ঠিকাদারের লোকজন নিম্নমানের ইট আনার পরে সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়। তার এলাকার কাজ যাতে খারাপ না হয় সেজন্য তদারকি করছেন মাত্র।
এ বিষয়ে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নূরুল ইসলাম সরদার বলেন, “ওই রাস্তার বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। হাসান মেম্বারই সবকিছু দেখাশোনা করছেন। ”
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত শেখ রামিম বলেছেন, রাস্তার পূর্বের সোলিংয়ের ইট অপসারণ করে কাজের পরিবেশ করে দিতে বিলম্ব হয়। এজন্য কাজ শুরু করতে আমাদের দেরি হয়। ভাটায় এখন খুব ভালো ইট পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক দূর থেকে ইট নিয়ে যেতে হচ্ছে। কাজ তুলতে আমাদের লোকসান হচ্ছে। বালুর বিষয়ে তিনি জানান, মানসম্মত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে পাশের মাটি ধুয়ে আসায় হয়ত কিছুটা কাঁদা যুক্ত মনে হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, “কাজের শুরুতে নিম্নমানের ইট আনা হয়েছিল। সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়। পরে মানসম্মত ইট এনে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। তবে পুনরায় নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে।”
বালুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

